বিডি সংবাদ৭১ কলাম মুক্তমত  
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি নাম মিজানুর রহমান আজহারী। ৩২ বছরের যুবক। বছর দুয়েক যাবত ওয়াজ করেছেন। এই স্বল্প সময়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছেন। সেই জন্যই বুঝি তার অনেক শত্রুও তৈরি হয়ে গেছে, যারা তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেই ক্ষান্ত হয় নি। প্রতিনিয়ত খিস্তি খেউর করে চলছে।
প্রথমেই আমি নিজের পরিচয় দেওয়া দরকার মনে করছি, যাতে কেউ ভুল না বোঝেন। আমি জামাতের পক্ষের লোক নই। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি অথবা কাদা ছোড়াছুঁড়ি কোনটাই আমার পছন্দ নয়। আমি মিলাদ পড়তে দেখলে নির্দ্ধিধায় শরীক হই। দ্বীনী কামেল পীর ও আউলিয়াদের প্রতি সবসময় ভক্তি ও সন্মান পোষন করি। কেউ সদুপদেশ দিলে শ্রদ্ধার সাথে পালন করার চেষ্টা করি। তবে টাকা-পয়সা, গরু-ছাগল নিয়ে মাজারে গিয়ে ইহকাল ও পরকালের মুক্তির চেষ্টা করি না, এবং এটাকে ভন্ডামী বলেই মনে করি। এসব দান খয়রাতের হক্বদার গরীব ও মিসকিন। তাদের খাওয়ালে আল্লাহ খুশি হবেন, ভুরিওয়ালা ও কোটিপতি পীর সাহেবের জৌলুষ বাড়াতে গিয়ে বুভুক্ষকে বন্চিত করা ইসলাম অনুমোদন করে না, করতে পারে না।
এই উপমহাদেশে বহু শতাব্দী ধরে ওলী-আউলিয়ারা তাশরিফ এনেছেন, এবং মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁদের জীবন ও কর্মধারা আজ কোথাও অবশিষ্ট নেই। তাদের মাজারগুলো জিম্মি করে বরং এক শ্রেনীর প্রতারক যুগ যুগ ধরে টুপাইস কামিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং কেউ মাজার পুজা অথবা মানতের বিরোধিতা করলেই তাকে সালাফী কিংবা ওহাবী মতবাদের লোক বলা অন্যায়। কেউ কেউ এদেরকে সৌদিপন্থী, এমনকি ইসরাইলপন্থী বলেও গালি দেন, যা খুবই নিন্দনীয়।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের মোটামুটি তিনটি গ্রুপে ভাগ করা যাবে – ১) আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক জামাতে ইসলাম, ২) কওমী মাদ্রাসা কেন্দ্রিক ইসলামিক ঐক্যজোট এবং ৩) মাজার কেন্দ্রিক তরিকত ফেডারেশন। এরমধ্যে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারী স্বীকৃতি পাওয়ার কারনে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যেই সব আলেম তৈরি হোন, তারা পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে স্বাভাবিক কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কওমী পড়ুয়া আলেমরা এই ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। আর যারা মাজার কেন্দ্রিক, তাদের ক্ষেত্রে শুধু পীরের ছেলে পীর, বাকী সবাই বংশ পরস্পরায় দাসতুল্য মুরিদ। সুতরাং এদের নিয়ে আলোচনা না করাই শ্রেয়।
উপমহাদেশে দেওবন্দ কেন্দ্রিক কওমী মাদ্রাসা শুরু হয়েছিলো বৃটিশ বিরোধী শক্তি হিসাবে। কিন্তু তারা বর্তমান যুগের চ্যালেন্জ গ্রহন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আজকে ইসলামের উপর আক্রমন কোথা থেকে কিভাবে আসছে, সেটা তারা বুঝতে এবং মোকাবিলা করতে ব্যর্থ। অনেক ক্ষেত্রে ইসলাম বিরোধীদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা জামাত বিরোধীতায় মেতে ওঠেন। ডা: জাকির নায়েক এবং তাঁর পিসটিভি যখন যুবসমাজ ও মা-বোনদের দ্বীনের পথে উদ্বুদ্ধ করছিলো, তখন এই হুজুররাই নেপথ্যে থেকে সরকারকে দিয়ে জাকির নায়েককে ব্যান্ড করেছে। এরাই আজ আবার মিজানুর রহমান আজহারীকে দেশছাড়া করিয়েছে। ইসলামের চেয়ে স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও অর্থলোভ কিছু আলেম নামধারীদের কাছে অনেক বড়।
হতে পারে তরুন আজহারী ওয়াজ করতে গিয়ে শুরুতে কিছু অনভিপ্রেত ও আপত্তিকর শব্দচয়ন করেছেন। তিনি নিজেও সেই জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তবে তার সাম্প্রতিক সময়ে হৃদয় ছুয়ে যাওয়া প্রান্জল বক্তব্য ও বিনয়ী আচরন লক্ষ লক্ষ মানুষকে মাহফিলে টেনে এনেছে। এমনকি সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পুলিশ ও প্রশাসনের অনেকেই আজহারী সাহেবের ভক্ত বনে গেছেন। আজহারী সাহেবের এটাই হচ্ছে আসল অপরাধ। তার বিরুদ্ধে চরমোনাই, মাজার পুজারী, মাইজভান্ডারী, নাস্তিক, বারো বাতারনী সব একযোগে মাঠে নেমে পড়েছে। তবে আল্লাহ চাইলে এসব বিষোদগার একদিন হয়ত বুমেরাং হয়ে যাবে। তিনি হয়ত বাংলার ইমাম আয়াতুল্লাহ মিজানুর রহমান আজহারী হয়ে যাবেন। সুতরাং তার শত্রুদের উচিত আজহারীকে গালিগালাজ না করে বরং প্রখর যুক্তি দিয়ে (যদি থাকে) তার ভুলগুলো তুলে ধরা। সেটা না করে, চরমোনাইর পীরসাহেব প্রকাশ্য ওয়াজ মাহফিলে আজহারীকে “ওরে বাটপার” বলে গালি দিলেন। বিনাভোটের এমপিরা সংসদে তার মুন্ডুপাত করলেন। এমনকি নাস্তিকেরাও সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে হুঙ্কার দিলেন। এগুলো চলতে থাকলে আজহারীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাড়বে, বৈ কমবে না।
আজকের বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশে আলেম এবং ওলামাদের ঐক্য দরকার, বিভেদ নয়। ইসলামের বিরুদ্ধে বহু পরাক্রমশালী শত্রু কুন্ডলী পাকাচ্ছে। কিছু হুজুর সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য বুঝে অথবা না বুঝে সেই আগুনে ঘি ঢালছেন। যদি আল্লাহকে ও পরকালকে ভয় করেন, তাহলে সময় থাকতে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসুন, ঐক্য গড়ে তুলুন এবং দেশ ও সমাজে দ্বীনের শান্তি কায়েম করুন।
সূত্রঃ এস, এম, কামাল হোসেন, ফ্লোরিডা।

SHARE