• .মফিজুল হক চৌধুরী
    আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে যারা নারিকেল, খেজুর গাছ পরিষ্কার করে কিংবা বনে বাদারে কাঠ কাটে, তাদের গাছি বলে ৷বর্তমানে তাদের মহা দুর্দিন ৷ কারণ তাদের জীবিকার হাতিয়ার শুধুমাত্র “দা ও রশি “I বর্তমান পরিস্থিতিতে দা-রশি নিয়ে বের হলেই- “ছেলে ধরা ” কিংবা “কল্লা কাটানী ” ! সুতরাং তথাকথিত গন পিটুনি এবং অবধারিত মৃত্যু ৷ আমাদের নৈতিক অধঃপত নীচে নামতে নামতে এমন তলানীতে গিয়ে ঠেকছে যে, এর থেকে উত্তরণের উপায় খুবই ক্ষীণ । পৃথিবী ক্রমাগত সামনের দিকে এগুচ্ছে;আর আমরা তার সহস্র গুন গতিতে পিছনের দিকে যাচ্ছি ৷ কানকথা, গুজব, রটনায় এমন বিশ্বাসী হয়ে পড়েছি যে, মানুষের চেহারার দিকে তাকানোর ফুরসৎ আমাদের নাই ৷ মানসিক রুগি, ছন্নছাড়া,ভবঘুরে, অপরিচিত মানুষ দেখলেই ছেলেধরা সন্দেহে অতি উৎসাহিরা জীবন ছিনিয়ে নিচ্ছে ৷
    মধ্যযুগে ঠগ,মগ, হার্মাদ, বগীদের সময় ছেলেধরা গুজব প্রচলিত ছিল ৷আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এইসব ভ্রান্ত ধারনা সম্পূর্ণ অচল ৷কবি নজরুল অনেক দিন আগে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “মানুষ যখন চাঁদে যাওয়ার সুত্র নিয়ে ব্যস্ত আমরা তখন বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজে বেড়াচ্ছি ৷”অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিজ দেশে গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে, পরিচিত দু’চারজন নিয়ে মানুষকে কাজের সন্ধানে বা একজায়গা থেকে আর এক জায়গা সফর করতে হবে ,নইলে নির্ঘাৎ মৃত্যু ৷
    আমাদের গ্রাম-শহরের অর্ধ শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের হাতে হাল জমানার শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি-“মোবাইল ও ইন্টারনেট ” এসে পড়াতে এমন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বলে আমি মনে করি Iআমরা এর ব্যবহার রপ্ত করার আগে অপব্যবহার রপ্ত করে বসে আছি । এর মাধ্যমেই সমাজে দ্রুত গুজব ছড়াচ্ছে ৷ দু’একজন দুষ্ট লোক ,দু’এক মিনিটের মিথ্যা নাটক ভিডিও করে নেটে ছেড়ে দিল সচেতনভাবে, আর তা না বুঝে অনেকেই শেয়ার করে বসলো ৷ ব্যস ,ঘটে গেল ঘটনা ৷
    দেশে কোথাও ব্রিজ, কালভার্ট, সেতু ,ফ্লাইওভার, টানেল নির্মান হলেই সুযোগ সন্ধানীরা এই গুজব ছড়িয়ে দেয়, সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে , অনেকে ঘোলাজলে মাছ শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, শত্রুতা হাসিল করার নিমিত্তে ৷ বলি দেওয়া হবে, কাটা মাথা লাগবে ! ইত্যাদি আজগুবি কুসংস্কারচ্ছন্ন কথা বর্তমান যুগে ও আমরা বিশ্বাস করছি কিভাবে ? শত কাটা মাথা নিয়ে গেলে মাথাবিহীন কাটা দেহগুলো কোথায় ? আমার মতে যেসব জায়গায় গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার মত ঘটনা ঘটে, ঐ সব জায়গায় ভিডিও ফুটেজ কিংবা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ২০/৩০ জনকে হত্যা মামলার আসামী করে পুলিশ প্রশাসন যদি ধরে নিয়ে কোর্টে চালান দেয়, তবেই এ ধরনের অপ-তৎপরতা থেকে সমাজ রেহাই পেতে পারে ৷ নইলে এটা আরো দ্রুত মহামারিতে রূপ নেবে ।
    অতএব, গাছিরা সাবধান ! দা-রশি নিয়ে জীবিকার অন্বেষণে বের হলে নির্ঘাৎ প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা আছে ।

SHARE